logo

বাংলাদেশের আদিবাসী কারা? এবং কারা নয়? কেন নয়?

“আদিবাসী” কারা, আর কারা নন, এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জটিল এবং এটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় দ্বারা নির্ধারিত হয়। সাধারণত, “আদিবাসী” শব্দটি সেই জনগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে যারা নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করে আসছে এবং যারা উপনিবেশ স্থাপন, বসতি স্থাপন, বা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের আগেই সেখানে ছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গবেষকরা আদিবাসী ও অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও সংজ্ঞা ব্যবহার করেন।

কারা আদিবাসী?

১. ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা:

  • আদিবাসী জনগোষ্ঠী সেই জনগোষ্ঠী যারা উপনিবেশ স্থাপন, বসতি স্থাপন, বা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেটিভ আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরিজিনাল জনগোষ্ঠী, এবং ভারতের আদিবাসী (আদিবাসী) জনগোষ্ঠীগুলি তাদের অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে বসবাস করে আসছে।

২. স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য:

  • আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, এবং বিশ্বাস ব্যবস্থা, যা মূলধারার সমাজ থেকে তাদের পৃথক করে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ আফ্রিকার সান জনগোষ্ঠী, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সামি, এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মাধ্যমে আলাদা।

৩. ভূমির সাথে গভীর সম্পর্ক:

  • আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরা ভূমির সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখেন, যা তাদের পরিচয়, জীবিকা, আধ্যাত্মিকতা, এবং ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এই সম্পর্ক শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক।

৪. স্ব-পরিচয়:

  • আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিজেরাই নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচিতি দিয়ে থাকে এবং তাদের একটি যৌথ পরিচয় ও ঐতিহ্যগত আবেগ রয়েছে। তারা নিজেদেরকে সমাজের অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে ভিন্ন হিসেবে গণ্য করে।

৫. উপনিবেশ বা প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতা:

  • অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় উপনিবেশ, প্রান্তিকতা, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বা বৈষম্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তাদের বর্তমান পরিচয় ও অবস্থান গড়ে তুলেছে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উদাহরণ:

  • নেটিভ আমেরিকান (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ফার্স্ট নেশনস ও ইনুইট (কানাডা)
  • অ্যাবরিজিনাল ও টরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ডার পিপলস (অস্ট্রেলিয়া)
  • মাওরি (নিউজিল্যান্ড)
  • সামি (নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং রাশিয়া)
  • আদিবাসী (আদিবাসী) (ভারত)
  • চাকমা, মারমা, এবং গারো (বাংলাদেশ)

কারা আদিবাসী নয়?

১. বসতি স্থাপনকারী ও উপনিবেশকারীরা:

  • যারা কোনো অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন বা দখল করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, তারা আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এবং আফ্রিকার ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা এসব অঞ্চলের আদিবাসী নন।

২. রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী:

  • অনেক দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হয় না, যদিও তারা সেই অঞ্চলে অনেক দিন ধরে বসবাস করছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী বা চীনের হান জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হয় না, কারণ তারা প্রান্তিক বা ভিন্ন সংস্কৃতির ধারক নয়।

৩. যে জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট ভূমির সাথে ঐতিহাসিক সংযোগ নেই:

  • সম্প্রতি অভিবাসনের মাধ্যমে বা অর্থনৈতিক কারণে যেসব জনগোষ্ঠী কোনো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে, তারা সাধারণত আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হয় না। উদাহরণস্বরূপ, যারা সম্প্রতি কোনো দেশে অভিবাসী হয়ে এসেছে বা কিছু প্রজন্ম ধরে কোনো অঞ্চলে বসবাস করছে, তারা আদিবাসী নয়।

তারা কেন আদিবাসী নয়?

  • ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অভাব:
  • অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সাথে সেই অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন বা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের আগের ইতিহাসিক সংযোগ থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের ঐতিহাসিক সংযোগ আদিবাসীদের পূর্ববর্তী সময় থেকে নেই।
  • সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান বা প্রভাব:
  • আদিবাসী পরিচয় অনেক সময় প্রান্তিকতা বা সংখ্যালঘু হওয়ার সাথে সম্পর্কিত। যে জনগোষ্ঠী একটি দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, এবং সামাজিক ব্যবস্থায় প্রভাবশালী বা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা আদিবাসী নয়।
  • স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অভাব:
  • অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাধারণত বৃহত্তর জাতীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে যায় এবং তাদের একটি স্বতন্ত্র, পৃথক সাংস্কৃতিক পরিচয় থাকে না। অন্যদিকে, আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রাখে যা তাদের আলাদা করে।

অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উদাহরণ:

  • উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এবং নিউজিল্যান্ডের ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী
  • বাংলাদেশের বাঙালি
  • চীনের হান জনগোষ্ঠী
  • দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকানার
  • জাপানের জাপানি

আদিবাসী পরিচয় মূলত ঐতিহাসিক সংযোগ, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, স্ব-পরিচয়, এবং প্রান্তিকতা বা উপনিবেশের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ভূমি এবং সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত থাকে, যেখানে অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাধারণত সেই সংযোগ বা ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে বঞ্চিত থাকে বা একটি সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি তাদের অধিকার, সংস্কৃতি সংরক্ষণ, এবং ইতিহাসের অন্যায় অবিচারগুলোকে স্বীকার করে প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

logo

© 2017 - 2026 Jumjournal | All rights reserved

জুমজার্নেলের কোন কন্টেন্টস ব্যবসার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হচ্ছে না। জুমজার্নালের কোন তথ্য বা কন্টেন্ট বিষয়ে অভিযোগ থাকলে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com

Donate us